বিশেষ প্রতিনিধি, Fasih Shaiyan।।
আইএমএফ - এর প্রেসক্রিপশন প্রত্যাখ্যান
শর্তহীন অস্বীকৃতি: IMF সংকটে পড়া দেশগুলোকে ঋণ দেওয়ার জন্য সুদের হার বৃদ্ধি এবং সরকারি খরচ কমানোর কঠোর শর্ত দিয়েছিল। মাহাথির বুঝতে পেরেছিলেন যে, এই শর্তগুলো মানলে মালয়েশিয়ার অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে। তাই তিনি IMF-এর আর্থিক সহায়তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন।
মূলধন নিয়ন্ত্রণ আরোপ
অর্থ পাচার রোধ: ১৯৯৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর মাহাথির আকস্মিকভাবে কঠোর "সিলেক্টিভ ক্যাপিটাল কন্ট্রোল" ঘোষণা করেন। এর ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা চাইলেই রাতারাতি তাদের পোর্টফোলিও বা নগদ অর্থ মালয়েশিয়া থেকে তুলে নিতে পারছিল না।
স্বল্পমেয়াদী বিনিয়োগে নিষেধাজ্ঞা: শেয়ার বাজার থেকে অর্জিত লভ্যাংশ বা মূলধন অন্তত এক বছর দেশের বাইরে নেওয়ার ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এর ফলে বাজার স্থিতিশীল হতে শুরু করে।
ডলারের বিপরীতে রিংগিতের মান নির্ধারণ
মুদ্রার মান স্থিরকরণ: মুদ্রা বাজারের ফটকাবাজ বা স্পেকুলেটরদের (যেমন জর্জ সোরোস) আক্রমণ থেকে স্থানীয় মুদ্রা রিংগিতকে রক্ষা করতে মাহাথির এর বিনিময় হার মার্কিন ডলারের বিপরীতে ১ ডলার = ৩.৮০ রিংগিত হিসেবে নির্দিষ্ট (Pegged) করে দেন।
অফশোর বাজার বন্ধ: দেশের বাইরে (যেমন সিঙ্গাপুরে) রিংগিতের যে অফশোর বাজার গড়ে উঠেছিল, তা পুরোপুরি অবৈধ ঘোষণা করা হয় এবং সমস্ত রিংগিতকে দেশের ব্যাংকিং সিস্টেমে ফিরিয়ে আনা বাধ্যতামূলক করা হয়।
সুদের হার হ্রাস এবং অভ্যন্তরীণ উদ্দীপনা (Keynesian Therapy)
ব্যবসা বাঁচানো: যেখানে IMF সুদের হার বাড়ানোর কথা বলেছিল, সেখানে মাহাথির সুদের হার কমিয়ে দেন। এর ফলে স্থানীয় উদ্যোক্তারা কম খরচে ঋণ নিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়।
সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি: সরকারি তহবিল থেকে বড় বড় প্রকল্পে অর্থায়ন বাড়ানো হয় (Fiscal Reflation) যেন বাজারে তারল্য বা ক্যাশ ফ্লো সচল থাকে এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়।
ব্যাংকিং ও করপোরেট খাত পুনর্গঠন
বিশেষ সংস্থা গঠন: ব্যাংকগুলোর অনাদায়ী ঋণ (Bad Loans) কিনে নেওয়ার জন্য 'দানাহর্তা' (Danaharta) এবং ব্যাংকগুলোকে নতুন করে মূলধন যোগাতে 'দানামোদাল' (Danamodal) নামে দুটি বিশেষ রাষ্ট্রীয় সংস্থা গঠন করেন। এর ফলে মালয়েশিয়ার ব্যাংকিং ব্যবস্থা দেউলিয়া হওয়া থেকে বেঁচে যায়।
কৌশলটির বৈশ্বিক প্রভাব ও ফলাফল
তৎকালীন সময়ে পশ্চিমা মিডিয়া এবং বিশ্বব্যাংক মাহাথিরের এই নীতিকে "আত্মঘাতী" বলে সমালোচনা করেছিল। তবে এক বছরের মধ্যেই মালয়েশিয়া কোনো বিদেশি ঋণের বোঝা ছাড়াই আইএমএফ-এর সাহায্য নেওয়া দেশগুলোর চেয়ে অনেক দ্রুত এবং শক্তিশালীভাবে অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ায়। পরবর্তীতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিটজসহ বহু আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ মাহাথিরের এই সাহসী কৌশলকে অনন্য এবং দূরদর্শী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হন।